শিল্প এলাকার ৬৭% কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি

প্রতি বছর ঈদের আগে শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় শ্রম অসন্তোষ দেখা দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে এসব এলাকার কারখানাগুলোকে নিবিড় পর্যালোচনায় রেখেছে শিল্প পুলিশ।

এর ধারাবাহিকতায় ঈদুল আজহার আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ পরিস্থিতিও নজরদারিতে রেখেছে সংস্থাটি। তাদের হিসাবে, দেশের আট শিল্প এলাকায় গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রায় ৬৭ শতাংশ কারখানায় বোনাস পরিশোধ হয়নি।

দেশে শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকা—আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেটে মোট কারখানার সংখ্যা ৯ হাজার ৬৮৩। ঈদ সামনে রেখে পোশাক শ্রমিকদের বোনাস গতকালের মধ্যে পরিশোধের কথা। তবে এখনো ঈদুল আজহার বোনাস পরিশোধ করতে পারেনি ৬ হাজার ৪৭১টি বা ৬৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ কারখানা। বোনাস পরিশোধ করেছে ৩ হাজার ২১২টি কারখানা (৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ)।

অন্যদিকে মে মাসের বেতন পরিশোধের কথা ৩ জুনের মধ্যে। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করেছে মাত্র ৭৮৬টি কারখানা। এ হিসেবে বেতন পরিশোধ করেছে মাত্র ৮ দশমিক ১২ শতাংশ কারখানা। বেতন পরিশোধ করেনি ৮ হাজার ৮৯৭ বা ৯৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কারখানা।

জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল গাজী জসীম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বড় দুটি সমস্যা ছিল, সেগুলো আমরা নিষ্পত্তি করতে পেরেছি। একটি টিএনজেড গ্রুপ। এটির মালিক দেশের বাইরে চলে গেছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ গ্রুপের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া মাহমুদ ফ্যাশনের সমস্যা ছিল, সেটাও সমাধান করা গেছে। এখন যেসব ঝামেলা আছে সেগুলো নিয়ে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করা যাচ্ছে। ছোটখাটো কিছু ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বুঝিয়ে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’

শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল কালিয়াকৈর থানাধীন সূত্রাপুর এলাকায় জিএমএস টেক্সটাইল লিমিটেড ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের সঙ্গে শিল্প পুলিশ আলোচনা করে সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশের ওপর আক্রমণ করেন। ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিক্ষেপ করতে থাকলে শিল্প পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। সকাল সাড়ে ৮টায় মহাসড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গত ২৮ মে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) এবং আরএমজি-বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজি-বিষয়ক টিসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আওতাধীন কারখানা/শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের আসন্ন ঈদে ছুটির বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস ৩১ মের মধ্যে এবং মে মাসের বেতন ৩ জুনের মধ্যে পরিশোধের বিষয়েও আলোচনা হয়। শ্রমিকদের মাসিক বেতন, ঈদ বোনাস পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে এমন কারখানার তালিকা উপস্থাপন করে শিল্প পুলিশ। তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তালিকার ছায়ালিপি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিইএফ বরাবর পাঠানোর বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়।

জানা গেছে, বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে এমন কারখানার মধ্যে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ বিভিন্ন খাতের কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা সংখ্যা ৬৯। বিকেএমইএর সদস্য কারখানা সংখ্যা ২২। সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর কারখানা সংখ্যা ২৪। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজার) আওতাভুক্ত কারখানা সংখ্যা ১২ এবং কোনো সংগঠনের সদস্য নয় এমন অন্যান্য কারখানা সংখ্যা ৭১। সব মিলিয়ে ব্যর্থ হতে পারে শিল্প পুলিশের চিহ্নিত এমন কারখানা সংখ্যা ১৯৮। সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে কিছুসংখ্যক কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে পারবে। ফলে ব্যর্থ হতে পারে এমন কারখানা ১৯৮টি থেকে কমে এসেছে।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব কারখানা, প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করতে ব্যর্থ হবে সেসব কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ১৯ মে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ৩ জুনের মধ্যে গামেন্টস কর্মীদের মে মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দিতে হবে। তবে শ্রমিকরা অযৌক্তিক কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায় নামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। পরে ২১ মে সচিবালয়ে এক সভা শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা ২৮ মের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। না হলে গার্মেন্টস মালিকদের জেলে যেতে হবে। এরই মধ্যে পাঁচ গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তারা দেশের বাইরে তো দূরে থাক, ঢাকার বাইরেও যেতে পারবেন না।’

আরও